পশ্চিম আফ্রিকাঃ কুমীর যেখানে খেলার সাথী।

কুমীর পৃথিবীর সবচেয়ে পরাক্রমশালী শিকারি প্রাণীগুলোর একটি।

পৃথিবীর সবচেয়ে বিতর্কিত প্রাণীগুলির মধ্যে একটি হ'ল কুমির। কেউ এটিকে ভয়ঙ্কর এবং রক্ত পিপাসু হিসাবে বিবেচনা করে, কেউ এটি দরকারী বলে মনে করেন এবং কেউকেউ পুরোপুরি নিশ্চিত হন যে, এই সরীসৃপগুলি আমাদের সময়ে বসবাসকারী ডাইনোসরগুলির আসল বংশধর। আমরা সবাই কুমির সম্পর্কে আকর্ষণীয় তথ্য জানি যা বিশ্বাস করা কঠিন। আসুন দেখি সত্য এখানে কোথায়…।   

1647492473-kk.png

সর্বোচ্চ শক্তিশালী চোয়ালের অধিকারী প্রাণীটি কামড়ের সময় প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে প্রায় -১৭০০ কেজি পর্যন্ত বল প্রয়োগ করতে সক্ষম। গোপনে ওত পেতে থাকা এবং ক্ষিপ্রগতিতে আক্রমণ করার ক্ষমতা এদেরকে প্রায় – সকল প্রাণীর কাছে মূর্তমান আতংক করে তুলেছে। তবে, আফ্রিকার কিছু মানুষের সাথে প্রাণীর গড়ে উঠেছে এক অসাধারণ বন্ধুত্ব। ডগন গোত্র আফ্রিকার সবচেয়ে ঐতিহ্যপূর্ণ গোত্রগুলোর একটি। মালির যে অঞ্চলটিতে এদের বসবাস , তা ডগন রাজ্য নামে পরিচিত।

ডগন রাজ্যে কুমির একটি পবিত্র প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। কথিত আছে , ডগনদের একজন পূর্বপুরুষকে কুমির নদীতে ভেসে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। সে সময় থেকেই এরা কুমিরকে নিজেদের প্রতিবিম্ব মনে করে। ডগনদের বিশ্বাস , একজন ডগন শিশুর জন্মের বিপরীতে একটি কুমির শিশুরও জন্ম হয়। ফলে, কুমিরের প্রতি আতিথেয়তা এদের সামাজিক কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। মানুষখেকো হিসেবে পৃথিবীব্যাপী প্রাণীর ব্যাপক কুখ্যাতি রয়েছে।

কিন্তু, বিস্ময়করভাবে এখানকার কুমিরগুলো অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির। কিছু কুমির এতোটাই বন্ধুসুলভ যে, ডগন শিশুরা এদের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। কুমির অধ্যুষিত খাকগুলোতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে সাঁতার কাটে। মালির পার্শ্ববর্তী দেশ বুর্কিনা ফাসোতেও কুমির ও মানুষের এক অসাধারণ মেলবন্ধন গড়ে উঠেছে।

দেশটির বাজুলে নামক গ্রামটি বন্ধুসুলভ কুমিরের জন্য বিশ্বখ্যাত। শত শত বছর ধরে এখানাকার মানুষ কুমিরের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছে। গ্রামবাসীর ভাষ্যমতে, প্রাচীনকালে এখানকার বাসিন্দারা যখন হ্রদটি থেকে পানি সংগ্রহে আসতো,কুমির কখনোই তাদের আক্রমণ করতো না ।

কুমিরগুলো নিরাপদে পানি সংগ্রহ করতে দেয় বলেই, গ্রামবাসীর বংশধারা চলমান রয়েছে। এখানকার মানুষ শিশুকাল থেকেই কুমিরদের সাথে সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করতে শেখে। ফলে, কুমীরগুলো হয়ে উঠেছে শিশু-কিশোরদের খেলার সাথী । বুর্কিনা ফাসো থেকে প্রায় ২ হাজার- কিলোমটার দূরে চাদের গেল্টা ডি’আর্কেই হ্রদে আরেক দল শান্তিপ্রিয় কুমিরের বসবাস।

সাহারা মরুভূমির এই ধু ধু প্রান্তরে কুমিরের দেখা পাওয়া অত্যন্ত বিস্ময়কর। বিদিয়েত যাযাবরগণ তাদের উটগুলোকে পানি পান করানো উদ্দেশ্যে এখানে নিয়ে আসে। এরা মনে করে, কুমিরদের রক্ষা করা এদের জন্য পবিত্র দ্বায়িত্ব । যদিও এই মহান দ্বায়িত্বের সঠিক কারণ এদের অজানা। হ্রদটির পার্শ্ববর্তী স্যাবু গ্রামের ৪০০ মানুষের জন্য কুমিরের যত্ন নেয়া ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ।

আপনি যদি দেখেন তীক্ষ্ণ দাঁতের এই কুমিরের পিঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট শিশুও তবে নিশ্চই অবাক হবে!

আবার অনেকের ভাষ্যমতে,  দেশের রাজধানী শহর ও ইগাডোগো থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে বাজুলা নামে একটি ছোট গ্রাম। এ গ্রামে রয়েছে একটি হ্রদ, যেখানে বাস করে ১০০রও বেশি কুমির। প্রচলিত আছে এই গ্রামে এক সময়ে প্রবল খরা দেখা দেয়। তখন গ্রামের নারীদের একটি গুপ্ত জলাশয়ের কাছে নিয়েযায় এই কুমিররা। আর তারপর থেকে প্রতিবছর কুমলাকরে নামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গ্রামবাসীরা। হ্রদের কুমিরদের খাওয়ানো হয় অনেক কিছু। যাতে গ্রামবাসীর উপর এই কুমিরদের আশীর্বাদ থাকে। তারা মনে করেন, এই কুমিরদের সাথে রয়েছে তাদের অনেক আগের সম্পর্ক।

এ গ্রামে কথিত আছে , বহুকাল আগে এদের একজন পূর্বপুরুষ তৃষ্ণায় মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছান। একটি কুমির লেজের সাহায্যে পানি পান করিয়ে সেই পূর্বপুরুষের প্রাণরক্ষা করেন। সেই সময় থেকেই কুমির গ্রামটির উপাস্য প্রাণী হয়ে ওঠে। রোগব্যাধি মুক্ত জীবন এবং শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে গ্রামবাসী মাঝে-মাঝেই কুমিরদের জন্য ছাগল ও মুরগী উৎসর্গ করে থাকেন।

এখানেও কুমিরের সাথে মানুষের সহাবস্থা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ। গ্রামের বাসিন্দারা নির্ভয়ে কুমিরগুলোকে স্পর্শ করতে পারেন। আফ্রিকার এ অঞ্চলটির কুমির-কেন্দ্রিক উপকথাগুলোর সত্যতা নিয়ে সংশয় থাকতে পারে। কিন্তু, কুমিরের সাথে এ ধরণের সম্পর্ক প্রাণীর প্রতি মানুষের ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এবং অসাধারণ এই ভালোবাসা জয় করেছে হিংস্রতাকেও।

বুর্কিনা ফাসোর কুমির-মানুষের এই অসম বন্ধুত্ব দেখতে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা। স্থানীয় পর্যটকরা বলতে শুনা যায়, বছরে এখন প্রায় পাঁচ হাজার পর্যটক যান পশ্চিম আফ্রিকার এইগ্রামে। চাইলে আপনিও ঘুরে দেখে আসতে পারেন এই গ্রাম থেকে। যেখানে দেখতে পারবেন মানুষ-কুমিরের বন্ধুত্ব এবং তাদের ভালোবাসা।

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.

লেখক সম্পর্কেঃ

hello, I am Shamim Farhad. I am a student.